পাহাড়ের কোলে নিভৃতে থমকে যায় সময় – এবারের গরমে গন্তব্য হোক দার্জিলিঙের চটকপুর

    
“বৃষ্টি পড়ে না এখানে বারোমাস , এখানে মেঘ গাভীর মত চড়ে”

      নাহ্! বারোমাস বৃষ্টি না পড়লেও পাহাড় মানেই তো মেঘ বৃষ্টি রোদ কুয়াশার খেলা। গ্রীষ্ম বর্ষা শীত তো সেখানে ব্রাত্যই। এমনিতেই বাঙলির পায়ের তলায় সর্ষ, বেড়িয়ে পড়ার বাহানা শুধু তাই। পাহাড় না সমুদ্র এই ঠিক করতে করতেই সময় হয়ে যায় ট্রেনের টিকিট কাটার। আর পাহাড় মানেই বাঙালি জানে চিরপরিচিত দার্জিলি। কিন্তু এই শহর কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে আশেপাশে কয়েকটি গ্রাম। পাহাড়ের আসল আমেজ পেতে চাইলে জনবহুল দার্জিলিঙের সীমানা ছাড়িয়ে এবারের গন্তব্য হোক তেমনই একটি গ্রাম। দার্জিলিং জেলার সেঞ্চল অভয়ারণ্যের গায়ে প্রায় আট হাজার ফুট উচ্চতায় মাত্র আঠেরোটি পরিবার নিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘামুখী ছোট্ট গ্রাম চটকপুর। সেই নির্জন, আত্মমগ্ন প্রকৃতিনিলীন গ্রামের ক্ষণচিত্রমালা হোক দুদিনের সফর ।  টাইগার হিলের পাশের পাহাড়টায় তন্দ্রাচ্ছন্ন শ্যামল গ্রামটার নাম চটকপুর। সিঞ্চল অভয়ারণ্যের আঁচলে থাকা এই ছবির মত পাহাড়ি গাঁয়ে উনিশঘর মানুষ থাকেন তাঁদের জৈব পদ্ধতির চাষ বাস ও পশুপালন নিয়ে। আর থাকে অজস্র পাখি; পাশের বনে থাকে বুনো শুয়োর, হরিণ, চিতা বাঘ, হিমালয়ের কালো ভাল্লুক আর ঝিঁঝিঁ পোকাদের কোরাস দল। লাল পান্ডাও নাকি দেখা যায়। এখানে মেঘের কারখানা আছে। সারাদিন কুয়াশার আদলে তৈরি হয় মেঘ আর রোদের ফাঁকে ফাঁকে চালান যায় কোথায় কোথায়। গুরুগম্ভীর কাঞ্চনজঙ্ঘা যেন নিদ্রামগ্ন বুদ্ধমূর্তি- রোদ কুয়াশার টানা পোড়েনে উদাসীন অবিচল আয়ত হয়ে থাকে।


Dhanmaya Niwas Homestay, Chatakpur,

               কাছের শহর বলতে সোনাদা, শিলিগুড়ি থেকে আসা যায়। এছাড়াও যাওয়া যায় লাটপাঞ্চোর থেকে বাগোরা হয়ে জঙ্গলের পথে। এ পথের সন্ধান গুগল ম্যাপে নেই। পাথর বসানো পথের বহর কয়েক হাত মাত্র, আর তার ওপর দিয়ে কিতকিত খেলার ভঙ্গিতে চলে গাড়ি। ধূপির অরণ্যে পথের পাশে পাশে অজস্র ফার্ণ আর নাম না জানা ফুলের দল আলিঙ্গনে বাঁধতে চায় পরদেশীদের। স্থানীয়রা বলে রাম্বির জঙ্গল। আছে প্রচুর বাঁশ গাছ, মালিংগো বাঁশ।  এখানে এই বাঁশ দিয়ে ঘর বাড়ি আসবাবপত্রও তৈরি হয়। পশ্চিম বঙ্গ সরকারের বন দফতরের ছবির মত রেস্ট হাউসটি এই বাঁশ দিয়েই বানানো, যদিও রেস্ট হাউসটি এখন বসবাসযোগ্য নেই। সম্ভবত খুব শিগগির সারানো শুরু হবে। এখান থেকে তাগদা হয়ে দার্জিলিং যাওয়া যায়, চটকপুর থেকে দার্জিলিঙের দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। এছাড়াও ঘুরে নিতে পারেন লামহাট্টা, অহলদাঁড়া,লেপচাজগৎ।


[ তথ্যচিত্রে ভেলোর – চিকিৎসা থেকে ভ্রমণ, সবকিছুর খুঁটিনাটি একঝলকে ]

               প্রজাপতি বসেছে ডানা মেলে গাছের পাতায়, যেন ম্যাপের পাতা। এর ইংরাজি নাম Map, বাংলায় বলে কাগজি। ঝোপে ঝাড়ে এদিক সেদিক নানা পাখি – বুশচ্যাট, ক্রস বিল ফিঞ্চ, রেডস্টার্ট, ইউহানা, হলদে খঞ্জন, লাল ঘুঘু, ফিঙে, পিপিট…। কিচির মিচির কিচির মিচির। দূরে কার ঘরে এফএম এ নেপালি গান বাজছে পাহাড়ি সুরে। এমন সুরে মন কেমন করে। বাগানের বেঞ্চে রোদে পিঠ রেখে তন্দ্রা এসে যায়।

                      সন্ধে হয়ে আসছে, বাঁ দিকের আকাশে রঙ ধরেছে। সামনে কাঞ্চনজঙ্ঘাও চাদর সরিয়ে দর্শনোন্মুখ। রূপসীর ওরনার মত মেঘ ভেসে এল আবডাল থেকে, আকাশের রঙ মুঠো মুঠো আবীর হয়ে ছড়িয়ে পরে তার সাথে। এক অপার্থিব সূর্যাস্ত। ভোরে সীমাহীন আকাশের পর্দায়  সিঁদুরের তিনটি ফোঁটা থেকে ক্রমে প্রকট হয় কাঞ্চনজঙ্ঘা।

কখন যাবেন

আলাদা করে পাহাড়ে বর্ষার আমেজ পেতে না চাইলে বর্ষাকাল বাদে যেকোনো সময় যেতে পারেন।

কিভাবে যাবেন

সোজাসুজি চটকপুর যেতে চাইলে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকেভাড়া গাড়িতে চলে আসুন চটকপুর। দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটার। শেয়ার গাড়িতে ঘুম হয়ে যাওয়া যায় চটকপুর।  নিকটবর্তী এয়ারপোর্ট বাগডোগরা৷ বাগডোগরা থেকে চটকপুরের দূরত্ব ৬১ কিলোমিটার।

কোথায় থাকবেন

প্রকৃত পাহাড়ি পরিবেশের আনন্দ নিতে থাকুন সুসজ্জিত বাগানঘেরা হোম স্টে গুলি তে।

১. বর্ষা রাইয়ের হোম স্টে- 8207221164,9933104230

২. সালাখা হোম স্টে – 9647744853

তাহলে, গরম তো আসলো বলে, ঝটপট টিকিট কেটে নেওয়ার পালা এখন।